
বিজয় কর রতন,
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রভাবে ঘোড়াউত্রা, ধনুসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পানির উচ্চতা বাড়তে থাকায় জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক তলিয়ে গেছে। ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিক ফেরিঘাটে ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এতে হাওরবাসীর যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “হাওরাঞ্চলের নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েকটি ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় দুর্ঘটনা এড়াতে এবং জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট ফেরিঘাটগুলোতে ফেরি চলাচল আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। পানি কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফেরি চলাচল পুনরায় শুরু করা হবে।” স্থানীয় সূত্র ও সওজ বিভাগ জানায়, পানিবৃদ্ধির কারণে করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখোলা ও চামড়াঘাট ফেরিঘাট, মিঠামইন উপজেলার শান্তিপুর ফেরিঘাট, ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ি ও বলদা ফেরিঘাট এবং বাজিতপুর উপজেলার পাটুলী ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক পানিতে ডুবে গেছে। এসব ফেরিঘাট হাওরাঞ্চলের লাখো মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফেরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষকে বিকল্পভাবে ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলার ব্যবহার করে নদী পারাপার করতে হচ্ছে। ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও রোগী পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। অনেককে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এছাড়া কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনেও দেখা দিয়েছে জটিলতা। ইটনা উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের বাসিন্দা মাসুম মিয়া বলেন, “কয়েক দিন ধরেই নদীর পানি বাড়ছিল। সোমবার সকালে এসে দেখি ফেরিঘাটের রাস্তা পুরোপুরি পানির নিচে চলে গেছে। ফলে ফেরি বন্ধ রয়েছে। আগে সহজেই ফেরিতে করে শহরে যাতায়াত করা যেত। এখন ছোট নৌকায় করে নদী পার হতে হচ্ছে, যা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টসাধ্য।” একই উপজেলার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “মিঠামইন থেকে বালিখোলা কিংবা জেলা শহরের দিকে যেতে ফেরিই ছিল সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। ফেরিতে গেলে অল্প সময়েই গন্তব্যে পৌঁছানো যেত। এখন নৌকায় করে যেতে হচ্ছে, এতে সময়ও বেশি লাগছে, খরচও বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের মালামাল পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে।” স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ফেরি বন্ধ থাকায় হাওরাঞ্চলে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাজারে কৃষিপণ্য, মাছ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা-নেওয়ায় অতিরিক্ত সময় লাগছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এদিকে কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার হাওরাঞ্চলের প্রায় সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “হাওরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি প্রতিদিনই বাড়ছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। এখনো কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পানির উচ্চতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।” আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানির স্তর আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।